৩১শে আগস্ট, ২০২৫

১৬ই ভাদ্র, ১৪৩২

৮ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৭

রবিবার

Shilpo Bangla Logo
FacebookYouTubeTelegram

সর্বশেষ খবর

LATEST NEWS

📰জাকসু নির্বাচন: ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ নামে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা

সম্পূর্ণ নিউজ

সিজোফ্রেনিয়া: বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার এক জটিল যাত্রা - কারণ, লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা

প্রতীকী ছবি

সিজোফ্রেনিয়া: বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার এক জটিল যাত্রা - কারণ, লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা

শিল্পবাংলা ডেস্ক,প্রকাশ: ৪ আগস্ট, ২০২৫ এ ১৩:৪৭

সিজোফ্রেনিয়া একটি গুরুতর এবং জটিল মানসিক রোগ, যেখানে ব্যক্তি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এটি কোনো সাধারণ 'পাগলামি' নয়, বরং একটি মস্তিষ্কের ব্যাধি যার জন্য সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তা প্রয়োজন। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে এই রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে।

 

সিজোফ্রেনিয়ার মূল বৈশিষ্ট্য

 

সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে:


হ্যালুসিনেশন (ভ্রম): এটি এমন অভিজ্ঞতা যেখানে ব্যক্তি এমন কিছু দেখে, শোনে, অনুভব করে, গন্ধ পায় বা স্বাদ গ্রহণ করে যা বাস্তবে নেই। সবচেয়ে সাধারণ হ্যালুসিনেশন হলো 'শ্রবণগত হ্যালুসিনেশন', যেখানে ব্যক্তি বিভিন্ন কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। এই কণ্ঠস্বরগুলো মন্তব্য করতে পারে, নির্দেশ দিতে পারে, বা এমনকি কথোপকথনও করতে পারে।

 

ডেলুশন (বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস): ডেলুশন হলো ভুল ও দৃঢ় বিশ্বাস যা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না এবং যুক্তির দ্বারাও পরিবর্তন করা যায় না। যেমন, কেউ বিশ্বাস করতে পারে যে সে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি, তার ওপর কেউ গুপ্তচরবৃত্তি করছে, বা তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র চলছে।

 

অগোছালো ভাবনা ও কথা: আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তা প্রক্রিয়া এলোমেলো হয়ে যেতে পারে, যার ফলে তাদের কথা বলা অসংলগ্ন এবং বুঝতে অসুবিধা হয়। তারা এক বিষয় থেকে হঠাৎ অন্য বিষয়ে চলে যেতে পারে, প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে পারে না, বা এমন শব্দ ব্যবহার করতে পারে যা অন্যদের কাছে অর্থহীন মনে হয়।

 

আচরণগত সমস্যা: সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অস্বাভাবিক বা অসংগঠিত আচরণ করতে পারে। এর মধ্যে উদ্দেশ্যহীন আন্দোলন, অদ্ভুত ভঙ্গি, উত্তেজনা, বা চরম নীরবতা (ক্যাটাতোনিয়া) অন্তর্ভুক্ত। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীন হতে পারে বা সামাজিক মেলামেশা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে।

 

আবেগের পরিবর্তন (নেতিবাচক লক্ষণ): এই লক্ষণগুলো হলো সাধারণ মানসিক কার্যকারিতার অভাব। যেমন, আবেগ প্রকাশে অক্ষমতা (মুখে কোনো ভাব না থাকা), আগ্রহের অভাব, উদ্যমহীনতা (কিছু করতে না চাওয়া), এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। এমনকি আনন্দের মুহূর্তেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া নাও দেখাতে পারে।

 

সিজোফ্রেনিয়া কেন হয়?

 

সিজোফ্রেনিয়ার সঠিক কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে এটি একাধিক কারণের সমন্বয়ে ঘটে বলে মনে করা হয়:

 

জেনেটিক কারণ: যদি পরিবারের কোনো সদস্যের সিজোফ্রেনিয়া থাকে, তাহলে অন্যদেরও এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে, শুধু জিনগত কারণই এর জন্য যথেষ্ট নয়; অনেক ক্ষেত্রে জিনগত প্রবণতা না থাকলেও রোগটি হতে পারে।

 

মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা: মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার, বিশেষ করে ডোপামিন এবং সম্ভবত গ্লুটামেটের ভারসাম্যহীনতা সিজোফ্রেনিয়ার বিকাশে ভূমিকা পালন করে। এই রাসায়নিকগুলো মস্তিষ্কের সংকেত প্রেরণে সহায়তা করে।

 

মস্তিষ্কের গঠনগত পার্থক্য: গবেষণায় দেখা গেছে যে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতায় কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকতে পারে, যেমন নির্দিষ্ট কিছু মস্তিষ্কের অংশে ধূসর পদার্থের পরিমাণ কম থাকা।

 

পরিবেশগত কারণ: কিছু পরিবেশগত কারণও এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর মধ্যে গুরুতর মানসিক চাপ বা ট্রমা, শৈশবের প্রতিকূল অভিজ্ঞতা, এবং কিছু মাদকদ্রব্যের ব্যবহার (যেমন ক্যানাবিস বা গাঁজা, বিশেষ করে উচ্চ মাত্রার THC যুক্ত) অন্তর্ভুক্ত। গর্ভাবস্থায় বা জন্মের সময়কার জটিলতাও একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হতে পারে।

 

নিউরোডেভেলপমেন্টাল কারণ: কিছু গবেষক মনে করেন যে সিজোফ্রেনিয়া মস্তিষ্কের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু হতে পারে, যদিও লক্ষণগুলো সাধারণত কৈশোর বা তরুণ বয়সে প্রকাশ পায়।

 

চিকিৎসা পদ্ধতি

 

সিজোফ্রেনিয়া নিরাময়যোগ্য না হলেও, সঠিক চিকিৎসা এবং সহায়তার মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো লক্ষণগুলি কমানো, রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং বারবার রোগ ফিরে আসা রোধ করা।

 

ঔষধ (Antipsychotic drugs): এটি সিজোফ্রেনিয়ার প্রধান চিকিৎসা। অ্যান্টিসাইকোটিক ঔষধ হ্যালুসিনেশন এবং ডেলুশন কমাতে সাহায্য করে মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে। এই ঔষধগুলো ট্যাবলেট, ইনজেকশন বা তরল আকারে পাওয়া যায়।

 

সাইকোথেরাপি:

 

কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT): এটি রোগীদের তাদের বিভ্রান্তিকর চিন্তা এবং হ্যালুসিনেশন মোকাবেলা করতে সাহায্য করে। সিবিটি একজন রোগীকে তাদের চিন্তাভাবনা এবং আচরণের প্যাটার্ন চিনতে ও পরিবর্তন করতে শেখায়।

 

ফ্যামিলি থেরাপি: পরিবারের সদস্যদের শিক্ষিত করা এবং সহায়তা প্রদান করা হয় যাতে তারা রোগীর সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারে এবং রোগীকে সমর্থন করতে পারে।

 

স্কিলস ট্রেনিং: সামাজিক দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান দক্ষতা শেখানোর মাধ্যমে রোগীদের সমাজে পুনরায় যুক্ত হতে সাহায্য করা হয়।

 

পারিবারিক সহায়তা: পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রোগীর সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বোঝাপড়া, ধৈর্য এবং সমর্থন রোগীকে ঔষধ চালিয়ে যেতে এবং থেরাপি নিতে উৎসাহিত করে।

 

নিয়মিত ফলোআপ: চিকিৎসকের নিয়মিত তত্ত্বাবধান এবং ঔষধের ডোজ সমন্বয় করা অত্যন্ত জরুরি। এটি রোগের লক্ষণগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং পুনরাবৃত্তি রোধ করতে সাহায্য করে।

 

মনে রাখবেন

  • সিজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ, তবে সঠিক চিকিৎসা এবং সহায়তার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুস্থ ও ফলপ্রসূ জীবনযাপন করতে পারে।
  • যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, ফলাফলের সম্ভাবনা তত ভালো। প্রাথমিক লক্ষণগুলি দেখা দিলে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
  • সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য এড়িয়ে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। এটি কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ।

 

যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গে ভুগে থাকেন, তবে দেরি না করে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। 

সিজোফ্রেনিয়ামানসিক রোগহ্যালুসিনেশনডেলুশনথেরাপিমনোরোগ বিশেষজ্ঞ