রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির গল্প শুধু মৃতের সংখ্যা, ধ্বংসস্তূপ আর উদ্ধার অভিযানের ইতিহাস নয়; এটি কিছু মানুষের ভেতর আজীবন বয়ে বেড়ানো অদৃশ্য ক্ষতের গল্পও। সেই ক্ষতের এক মর্মান্তিক নাম—নওশাদ হাসান হিমু, যিনি অনেকের কাছে হিমালয় হিমু, আবার কারও কাছে কালা পাহাড়।
রানা প্লাজা ধসের পর চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধারে তিনি ছিলেন অন্যতম নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকর্মী। ধ্বংসস্তূপের ভেতর জীবনের শেষ আশ্রয় খুঁজতে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছাতে তাকে এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যা কোনো মানুষের মন সহজে বহন করতে পারে না। বাঁচানোর তাগিদে কখনো যন্ত্রপাতি দিয়ে আটকে পড়া মানুষের হাত-পা কেটে উদ্ধার করতে হয়েছে—যে অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাকে তাড়া করে ফিরেছে।
শোনা যায়, এরপর থেকে তিনি আর স্বাভাবিকভাবে গোশত খেতে পারতেন না। প্লেটে ঝোল দেখলেই মানুষের রক্তের স্মৃতি ফিরে আসত। যে মানুষ জীবন বাঁচাতে ধ্বংসস্তূপে নেমেছিলেন, সেই মানুষই পরে নিজের ভেতরের ধ্বংসস্তূপ থেকে আর বের হতে পারেননি।
হিমুর কথিত একটি বাক্য আজও মানবতার গভীর ঘোষণা হয়ে থাকে—“কোনো বিপ্লবে যদি একজন মানুষেরও মৃত্যু হয়, তিনি সেই বিপ্লব চান না।” এই বাক্যে একজন উদ্ধারকর্মীর হৃদয়, একজন মানবিক মানুষের দর্শন এবং রানা প্লাজার ভয়াবহতার অন্তর্লীন অভিঘাত একসঙ্গে ধরা পড়ে।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির তিন বছর পর, আজকের দিনেই নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়েছিলেন হিমালয় হিমু। তার মৃত্যু কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি সেই রাষ্ট্র, সমাজ ও শিল্পব্যবস্থার প্রতি এক নীরব প্রশ্ন, যেখানে ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ বাঁচানো মানুষটিকেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি।
রানা প্লাজা আমাদের শেখায়—ভবন নির্মাণে অনিয়ম, প্রশাসনিক উদাসীনতা, মালিকের লোভ এবং শ্রমিকের জীবনকে তুচ্ছ করার সংস্কৃতি একদিন শুধু ভবন ভাঙে না; ভেঙে দেয় মানুষের মন, পরিবার, সমাজের বিবেকও।
আজ হিমালয় হিমুর মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আর কোনো রানা প্লাজা নয়। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দেখলে নীরবতা নয়, প্রতিবাদ করতে হবে। নির্মাণে অনিয়ম দেখলে আপস নয়, অভিযোগ জানাতে হবে। কারণ একটি ফাটল কখনো শুধু দেয়ালে থাকে না—সেটি একদিন মানুষের জীবন, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎকে চিরে




