নিজস্ব প্রতিবেদক: পটুয়াখালীর গলাচিপা সহকারী জজ আদালতে বিচারাধীন একটি দেওয়ানি মামলার নথিপত্র ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব মিলন চৌধুরী এবং তাঁর চেম্বারের দুই জুনিয়র আইনজীবীর বিরুদ্ধে বাদীপক্ষের এক স্বজনকে গালিগালাজ, হেনস্তা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অ্যাডভোকেট মিলন চৌধুরী।
গলাচিপা সহকারী জজ আদালতে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলা নং ১২৯১/২১-এর প্রথম বাদী আব্দুল বাকী। বাদীপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলার মূল বাদী তাঁর ভাই আব্দুল মালেক। বিরোধটি ২০১৭ সাল থেকে চলমান। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় আব্দুল মালেকের পক্ষে তাঁর ভাতিজা এস এম আশিকুর রহমান মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করতে অ্যাডভোকেট মিলন চৌধুরীর চেম্বারে যান।
বাদীপক্ষের দাবি, প্রায় নয় বছর ধরে মামলাটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন অ্যাডভোকেট মিলন চৌধুরী। দীর্ঘ সময়েও মামলার প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়া এবং আইনজীবীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় পরিবারটি অন্য আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই উদ্দেশ্যেই মামলার নথিপত্র ফেরত নিতে চেম্বারে যান আশিকুর রহমান।
এস এম আশিকুর রহমানের অভিযোগ, নথিপত্র ফেরত চাইলে অ্যাডভোকেট মিলন চৌধুরী তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার জন্য তেড়ে আসা হয়। এ সময় চেম্বারে থাকা জুনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন ও অ্যাডভোকেট লাবুও তাঁর ওপর চড়াও হন এবং তাঁকে ঘিরে ধরে গালিগালাজ ও হেনস্তা করেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে এস এম আশিকুর রহমান দৈনিক শিল্পবাংলাকে বলেন, “আমরা পেশাগত সম্মান ও পূর্ণ আস্থা রেখে অ্যাডভোকেট মিলন চৌধুরীকে দীর্ঘদিন মামলার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ ৯ বছরেও কোনো অগ্রগতি না হওয়া এবং বিবাদীপক্ষের রিয়াজ শিকদারের সঙ্গে অনৈতিক যোগসাজশের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় আমরা নথিপত্র ফেরত চাই। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের গালিগালাজ করেন এবং চেম্বারের জুনিয়রদের নিয়ে আমাকে চরমভাবে হেনস্তা করেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বাধ্য হয়ে আইনজীবী পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অ্যাডভোকেট মিলন চৌধুরীর এমন অপেশাদার ও অসংবেদনশীল আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার জোরালো দাবি জানাচ্ছি।”
বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, “বিগত স্বৈরাচারী আমলের দুর্নীতির ধারা এখনও ভাঙেনি। আমার মতো সচেতন মানুষের সঙ্গে এমন অন্যায় হলে সহজ-সরল সাধারণ মানুষের অবস্থা অনুমেয়। আমরা বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত ও সহজ করার দাবি জানাচ্ছি—যেন কোনো মামলা ২–৩ বছরের বেশি না ঝুলে থাকে এবং সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার না হয়।”
সব অভিযোগ অস্বীকার মিলন চৌধুরীর
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব মিলন চৌধুরী দৈনিক শিল্পবাংলাকে বলেন, “সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা! তাকে মানসিক প্রতিবন্ধী বলে মনে হয়। সে খুব খারাপ আচরণ করছে।”
আশিকুর রহমান এর আগে মামলার বিষয়ে তাঁর কাছে আসেননি বলেও দাবি করেন মিলন চৌধুরী। তিনি বলেন, “এই মামলা যে দিয়েছে সে আসে নাই। ও তো নতুন আসছে, ও এর আগে আসে নাই কখনো। ও বেয়াদবি করছে।”
ঘটনার বিষয়ে আরও তথ্য জানতে প্রতিবেদককে রিয়াজ শিকদারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন মিলন চৌধুরী। তিনি বলেন, “রিয়াজ শিকদার—তার সঙ্গে আলাপ করেন, সে এটা ভালো জানে। আপনি চাইলে আমি রিয়াজ শিকদারের নম্বরটা আপনাকে দিতে পারি।”
একই সঙ্গে পটুয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “আপনি এ বিষয়ে বারের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলতে পারেন, তারা এটা ভালো জানে।”
বাদীপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিয়াজ শিকদার মামলার বিবাদীপক্ষের একজন এবং সালাম শিকদারের ভাগিনা। এস এম আশিকুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অভিযোগে বিবাদী পক্ষের রিয়াজ শিকদারের সঙ্গে অ্যাডভোকেট মিলন চৌধুরীর অনৈতিক যোগাযোগ বা যোগসাজশের প্রসঙ্গও এসেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো তথ্য এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় দৈনিক শিল্পবাংলার হাতে আসেনি।
বাদীপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর শেষ পর্যন্ত মামলার নথিপত্র তাদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কোনো পেশাগত অসদাচরণ বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও পেশাগত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পটুয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়েছে অভিযোগকারী পক্ষ।
এদিকে, অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন ও অ্যাডভোকেট লাবুর পৃথক বক্তব্য এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।


