নিজস্ব প্রতিবেদক:সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করে আইন কার্যকর থাকার পরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ২২ ক্যাটাগরির ৫৯টি পদে সর্বোচ্চ বয়সসীমা রাখা হয়েছে ৩০ বছর। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রেজিস্ট্রারের অজানা নয় বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন-২) লুৎফর রহমান আরিফ। তাঁর ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা পরিবর্তন বা এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না আসায় বয়সসীমায় পরিবর্তন আনা হয়নি।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে ৩৯ ক্যাটাগরিতে মোট ১০০টি শূন্যপদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৯ নম্বর পর্যন্ত মোট ২২ ক্যাটাগরির ৫৯টি পদের জন্য আবেদনকারীর বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে হতে হবে বলে বিজ্ঞপ্তির সাধারণ শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন নিয়োগ পোর্টালেও সংশ্লিষ্ট পদের ক্ষেত্রে ৩০ বছরের বয়সসীমা কার্যকর দেখা যাচ্ছে।
অথচ চলতি বছরের ১০ এপ্রিল কার্যকর হওয়া ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল কর্পোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ আইন, ২০২৬’-এ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা নিয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
আইনের ৪(১) ধারার শুরুতেই বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন বা আইনের মর্যাদাসম্পন্ন দলিলে যা-ই থাকুক না কেন, পরবর্তী বিধানগুলো কার্যকর হবে।
একই আইনের ৪(১)(গ) ধারায় বলা হয়েছে, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল কর্পোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাগুলোর যেসব পদে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ‘৩০ বছর’ বা ‘অনূর্ধ্ব ৩২ বছর’ উল্লেখ রয়েছে, সর্বত্র সেই বয়সসীমা ‘৩২ বছর’ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে।
আইনের ৪(২) ধারায় আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়োগবিধি বা প্রবিধানমালায় কোনো পদে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা আগে থেকেই ৩২ বছরের বেশি নির্ধারিত থাকলে সেই উচ্চতর বয়সসীমা অপরিবর্তিত থাকবে।
আইনে ৩২, বিজ্ঞপ্তিতে ৩০
রাষ্ট্রের আইনে স্বায়ত্তশাসিত ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করে ৩০ বছরের বয়সসীমা ৩২ বছর দ্বারা প্রতিস্থাপনের বিধান থাকার পরও জাবির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ২২ ক্যাটাগরির ৫৯টি পদে ৩০ বছরের সীমা রাখায় প্রশ্ন উঠেছে।
মূল প্রশ্ন হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালায় থাকা ৩০ বছরের সীমা আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত সেটিই বহাল থাকবে, নাকি ২০২৬ সালের আইন কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সরাসরি নিয়োগে ৩২ বছরের বিধান প্রযোজ্য হবে?
প্রশাসনের বক্তব্য: ‘রেজিস্ট্রার মহোদয়ও অবগত, প্রশাসনও অবগত’
বয়সসীমার এই পার্থক্যের কারণ জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরে যোগাযোগ করে দৈনিক শিল্পবাংলা। রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কয়েক দফা কল ট্রান্সফারের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন-২) লুৎফর রহমান আরিফের কাছে কলটি হস্তান্তর করা হয়।
কেন বিজ্ঞপ্তিতে ৩০ বছরের বয়সসীমা রাখা হয়েছে—জানতে চাইলে লুৎফর রহমান আরিফ বলেন, “এটা তো আসলে আমাদের নীতিমালা সংশোধনের ব্যাপার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা অথরিটির সিদ্ধান্তের ব্যাপার।”
বিষয়টি প্রশাসনের অজানা কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “রেজিস্ট্রার মহোদয়ও অবগত আছেন এবং প্রশাসনও অবগত আছে এটা। কিন্তু কোনো সংশোধন বা নির্দেশনা আসে নাই।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, নীতিমালা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হলে সে অনুযায়ী বয়সসীমাতেও পরিবর্তন আনা হবে।
সামনে বয়সসীমা পরিবর্তন হতে পারে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটা যখন হবে, নীতিমালা যদি পরিবর্তন করে আমরা ওই অনুযায়ী করব।”
নীতিমালা সংশোধনের অপেক্ষা বনাম আইনের বিধান
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ৩০ বছরের বয়সসীমা পরিবর্তনের বিষয়টি নীতিমালা সংশোধন এবং প্রশাসনিক বা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বক্তব্যে এটিও উঠে এসেছে যে, ৩২ বছরের বয়সসীমার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রেজিস্ট্রারের জানা রয়েছে; তবে এ বিষয়ে নীতিমালা সংশোধন বা নির্দেশনা আসেনি।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের আইনের ৪(১) ধারার শুরুতেই অন্য কোনো আইন বা আইনের মর্যাদাসম্পন্ন দলিলে ভিন্ন কিছু থাকলেও ওই ধারার বিধান কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই ধারার (গ) উপদফায় স্বায়ত্তশাসিত ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের যেসব পদে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর বা অনূর্ধ্ব ৩২ বছর রয়েছে, সেখানে তা ৩২ বছর দ্বারা প্রতিস্থাপনের বিধান রয়েছে।
ফলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধিত না হওয়া পর্যন্ত ৩০ বছরের সীমা বহাল রাখার সুযোগ রয়েছে কি না, নাকি আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট সরাসরি নিয়োগে ৩২ বছরের সীমা কার্যকর হওয়ার কথা।
৩০ থেকে ৩২ বছর বয়সীদের কী হবে?
এই পার্থক্যের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে চাকরিপ্রার্থীদের ওপর। বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৯ নম্বর পর্যন্ত ২২ ক্যাটাগরির ৫৯টি পদের জন্য আবেদনকারীর বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে হতে হবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রের আইনে সংশ্লিষ্ট শ্রেণির প্রতিষ্ঠানের সরাসরি নিয়োগে বিদ্যমান ৩০ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমাকে ৩২ বছর দ্বারা প্রতিস্থাপনের বিধান রয়েছে।
ফলে ৩০ বছরের বেশি কিন্তু ৩২ বছরের মধ্যে থাকা এবং অন্যান্য যোগ্যতা পূরণকারী প্রার্থীরা জাবির এই ৫৯টি পদে আবেদনের সুযোগ পাচ্ছেন কি না—সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
আইনের ৪(১)(গ) ধারার বিধান যদি বিজ্ঞপ্তির এসব পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তাহলে ৩০ বছরের শর্ত বহাল রাখার প্রশাসনিক ও আইনগত ভিত্তি কী—তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় যদি মনে করে সংশ্লিষ্ট পদগুলোতে ৩০ বছরের সীমাই বহাল থাকবে, তাহলে কোন বিধানের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের আইনের ৩২ বছরের সীমা এসব নিয়োগে প্রযোজ্য হচ্ছে না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তির এই বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩২ বছরে পরিবর্তনের কোনো সংশোধনী বা নতুন নির্দেশনার কথা জানা যায়নি। ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান আরিফের বক্তব্য অনুযায়ী, নীতিমালা পরিবর্তন হলে বিশ্ববিদ্যালয় সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
মেলেনি ইউজিসির সুস্পষ্ট বক্তব্য :
বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয়। তবে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি অন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
রাষ্ট্রের কার্যকর আইনে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সরাসরি নিয়োগে ৩০ বছরের বয়সসীমা ৩২ বছর দ্বারা প্রতিস্থাপনের বিধান থাকার পরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ ক্যাটাগরির ৫৯টি পদে ৩০ বছরের সীমা বহাল থাকার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় আইনের বাস্তবায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

