৩১শে আগস্ট, ২০২৫

১৬ই ভাদ্র, ১৪৩২

৮ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৭

রবিবার

Shilpo Bangla Logo
FacebookYouTubeTelegram

সর্বশেষ খবর

LATEST NEWS

📰জাকসু নির্বাচন: ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ নামে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা

সম্পূর্ণ নিউজ

মব সহিংসতা ও গণপিটুনি ইসলামে নিষিদ্ধ

প্রতীকী ছবি

মব সহিংসতা ও গণপিটুনি ইসলামে নিষিদ্ধ

শিল্পবাংলা ডেস্ক,প্রকাশ: ১৩ জুলাই, ২০২৫ এ ১৯:৫৬

মব সহিংসতা (Mob Violence) ও গণপিটুনির (Mob Lynching) ঘটনা বাংলাদেশের সমাজ ও আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। এটি আইনহীনতার পরিচয় এবং সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। অনেক মানুষ জানেই না যে, গণপিটুনি আইনত অপরাধ এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

 

মব সহিংসতা (Mob Violence) বলতে বোঝায় যখন কোনো দল বা জনতা সংঘবদ্ধভাবে হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালায়, যা সাধারণত নিয়ন্ত্রণহীন ও আকস্মিকভাবে ঘটে। এটি সাধারণত ব্যক্তিগত বা দলীয় ক্ষোভ, গুজব, রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্তেজনা, ধর্মীয় বিদ্বেষ বা জাতিগত বিদ্বেষের কারণে ঘটতে পারে। আর গণপিটুনি (Mob Lynching) হলো যখন উত্তেজিত জনতা বা জনসমষ্টি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহের বশে বা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে মারধর করে, যা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি সাধারণত গুজব, রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্তেজনা, ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ বা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে ঘটে। 

 

ইসলামি শরিয়া আইন, বাংলাদেশের সংবিধান, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী গণপিটুনি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দেশের মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

 

 

ইসলাম শান্তি, ন্যায়বিচার ও আইন মেনে চলার শিক্ষা দেয়। মব সহিংসতা ও গণপিটুনি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, কারণ এটি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

 

আইন নিজের হাতে নেওয়া হারাম: ইসলামে বিচার ও শাস্তি দেওয়ার অধিকার শুধু রাষ্ট্র ও যোগ্য বিচারকদের রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিজে থেকে বিচার করতে গিয়ে কাউকে আক্রমণ বা হত্যা করে, তবে তা স্পষ্টভাবে হারাম (নিষিদ্ধ) বলে বিবেচিত হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর কেউ যদি কোনো মানুষকে হত্যা করে কোনো প্রাণের বিনিময়ে বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজের শাস্তি ছাড়া, তবে সে যেন সমস্ত মানবজাতিকে হত্যা করলো। আর যে ব্যক্তি কাউকে অবৈধ হত্যাকান্ড থেকে রক্ষা করলো সে যেন সকল মানুষকেই রক্ষা করলো।’ -সূরা আল মায়িদা: ৩২

 

গুজব ও মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো নিষিদ্ধ: মব সহিংসতার অনেক ঘটনা গুজব ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটে। ইসলাম কঠোরভাবে গুজব ছড়ানো ও মিথ্যা বলাকে নিষেধ করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা যা জানো না, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর; এসবের প্রতিটির ব্যাপারেই জিজ্ঞাসা করা হবে।’ -সূরা আল ইসরা: ৩৬

 

অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করলে কঠোর শাস্তি: মব সহিংসতায় অনেক নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারায়। ইসলাম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে হত্যাকারীদের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন মু’মিনকে হত্যা করে তার শাস্তি হবে জাহান্নাম। তার মধ্যে সে সদা সর্বদা থাকবে এবং আল্লাহ্ তা‘আলা তার প্রতি ক্রদ্ধ হবেন ও তাকে অভিশাপ দিবেন। তেমনিভাবে তিনি তার জন্য প্রস্ত্তত রেখেছেন ভীষণ শাস্তি।’ -সূরা আন নিসা: ৯৩

 

এই ধরনের হত্যাকান্ডকে হাদীসের পরিভাষায় সর্ববৃহৎ গুনাহ্ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আনাস্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) বলেছেন, 'সর্ববৃহৎ কবীরা গুনাহ্ হচ্ছে চারটি: আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা, কোন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে হত্যা করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা কথা বলা। বর্ণনাকারী বলেন: হয়তো বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: মিথ্যা সাক্ষী দেয়া।' বুখারী: ৬৮৭১; মুসলিম: ৮৮

 

আরেকটি হাদিসে এসেছে, আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'কিয়ামতের দিন মানবাধিকার সম্পর্কিত সর্বপ্রথম হিসেব হবে রক্তের।' বুখারী: ৬৫৩৩, ৬৮৬৪; মুসলিম: ১৬৭৮

 

হাদিসে আরও এসেছে, আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ কোন কাফিরকে হত্যা করলো সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না; অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।' বুখারী:  ৩১৬৬, ৬৯১৪

 

ন্যায়বিচার ও ধৈর্যের শিক্ষা: ইসলাম মানুষকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার এবং ধৈর্য ধরার আদেশ দিয়েছে। উত্তেজিত হয়ে অন্যায় কাজ করা ইসলাম সমর্থন করে না। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা রাগ করো না।’ -সহিহ বোখারি: ৬১১৬

 

আরও বলা হয়েছে, ‘সাবধান! যদি তোমরা কোনোকিছুতে সন্দেহ করো, তাহলে যাচাই করো।’ -সহিহ মুসলিম: ২৮৭৩

 

এক হাদিসে এসেছে, একবার এক বেদুইন (গ্রাম্য ব্যক্তি) মসজিদে নববির ভেতরে প্রস্রাব করতে শুরু করে। এটি দেখে সাহাবিরা ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রস্রাব শেষ করতে দাও।’ এরপর হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধীরস্থিরতার সঙ্গে তাকে ডেকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য; নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও আল্লাহর জিকিরের জন্য বানানো হয়েছে। এখানে এই ধরনের কাজ করা উচিত নয়।’ পরবর্তীতে তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন, সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার করে দিতে। সহীহ মুসলিম: ২৮৪

 

গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা আজ একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে দেশের সকল নাগরিক, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মব সহিংসতা ও গণপিটুনি প্রতিরোধে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে গণপিটুনির সঙ্গে সম্পৃক্ত সব অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে, গুজব প্রতিরোধে গণসচেতনতা বৃদ্ধি (সোশ্যাল মিডিয়া ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রচারণা) করতে এবং এলাকাভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে এবং দেশের সকল নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। সেইসঙ্গে দেশের সচেতন সমাজ ও গণমাধ্যমকে গণপিটুনির বিষয়ে দেশের সব নাগরিককে সচেতন করে গড়ে তুলতে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

মনে রাখতে হবে, মব সহিংসতা ও গণপিটুনি ইসলামের মূলনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এটি অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ইসলামের আদর্শ হলো- শান্তি, ন্যায়বিচার ও ধৈর্য ধরে সঠিক পথ অনুসরণ করা। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই মব সহিংসতাকে সমর্থন করা যাবে না, বরং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ অনুসন্ধান করতে হবে।

ইসলামধর্মশেষ জামানাকেয়ামতহাদিসহত্যাসহিংসতাফিতনামব সহিংসতাগণপিটুনিআইনমানবাধিকার